“মহাভারতে শ্রীকৃষ্ণ” - শ্রী জয় রায় (Part 2)
(পর্ব ৪)
-----------------------------
মহাভারতে কুরুপাণ্ডবদের পারিবারিক কলহকে কেন্দ্র করে তৎকালীন ভারতের রাজন্যবর্গ নিজ নিজ স্বার্থ চরিতার্থ করার খেলায় মত্ত হয়েছিলো। কুরুকুলের প্রাচীন শত্রু ছিল মৎস্যদেশ (বর্তমান জয়পুরের নিকটবর্তি স্থান)। মৎস্যদেশের রাজা বিরাট। আবার, মৎস্যদেশের সাথে চিরশত্রুতা ছিল মদ্রদেশের। পঞ্চ-পাণ্ডবদের মামা অর্থ্যাৎ মাদ্রীর ভাই “শল্য” ছিল মদ্রদেশের রাজা। বলা হয়ে থাকে, এই সকল কারনেই পাণ্ডবদের মামা শল্য যুদ্ধে কৌরবপক্ষে যোগ দেন।
অন্যদিকে কৌরবদের আধিপত্যকে পাঞ্চালরাজ দ্রুপদ (দ্রৌপদীর পিতা) কোনদিন স্বীকার করেন নি। যাদবগণও চিন্তিত; কারন দ্রুপদ অতীতে জরাসন্ধের সাথে যোগ দিয়ে ১৮ বার মথুরা আক্রমণ করে। এই সকল রাজনৈতিক জটিলতা ছিল শ্রীকৃষ্ণের চিন্তার কেন্দ্রবিন্দু। তাই, যুদ্ধ অনিবার্য জেনেও শ্রীকৃষ্ণ চেয়েছিলেন শান্তি।
শান্তি আলোচনার জন্য শ্রীকৃষ্ণ হস্তিনাপুরে দ্রুপদকে দূতরূপে পাঠালেও সে চেষ্টা ব্যর্থ হয়। অপরদিকে, সঞ্জয় (ধৃতরাষ্ট্রের সারথি) দূত হিসেবে আসে পাণ্ডবশিবিরে। শ্রীকৃষ্ণের মনোভাব অবগত হয়েই যুধিষ্ঠির সঞ্জয়কে মাত্র পাঁচটি গ্রাম দেবার জন্য আবেদন করে।সঞ্জয়ের মাধ্যমে কৌরবরা জানতে পারে, “মাত্র পাঁচটি গ্রাম দিলেই যুদ্ধ এড়ানো সম্ভব হবে।” কিন্তু, দুর্যোধন এই প্রস্তাবকে পাণ্ডবদের ভয় ও দুর্বলতা মনে করলো। তিনি দম্ভ প্রকাশ করে বললো, “বিনা যুদ্ধে তীক্ষ্ণ সূচের অগ্রভাগ দ্বারা যতটুকু ভুমি বিদ্ধ হয়, ততটুকু ভূমিও পাণ্ডবদের দেওয়া হবে না।”
সমগ্র শান্তি প্রচেষ্টা ব্যর্থ হল। কিন্তু, শেষ চেষ্টা করার জন্য শ্রীকৃষ্ণ নিজেই এবার হস্তিনাপুরে যাবার সিদ্ধান্ত নিলেন। হস্তিনাপুরে যাবার আগে শ্রীকৃষ্ণ সন্ধির বিষয়ে মতামত চাইলে যুধিষ্ঠির-অর্জুন ও ভীম নিজেদের মধ্য রক্তক্ষয় বন্ধ করার জন্য শ্রীকৃষ্ণকে অনুরোধ করে।
এদিকে শ্রীকৃষ্ণ সন্ধি প্রস্তাব নিয়ে গেলে, দুর্যোধন শ্রীকৃষ্ণকে বন্দি করতে চায়। শ্রীকৃষ্ণ জানতেন দুর্যোধনের এই হীন ষড়যন্ত্রের কথা। কারন, পূর্বে শ্রীকৃষ্ণের কাছে পরাজিত হয়ে প্রতিহিংসার সুযোগ নেবার জন্য ভারতের অসংখ্য রাজা যোগ দিয়েছে কৌরব শিবিরে। মহাভারতে ধৃতরাষ্ট্রের জীবনে দেখা যায় তাঁর বিবেক বুদ্ধি মাঝে মাঝে তাঁকে ধর্মপথে চলতে সাহায্য করেছে। কিন্তু, তার সেই শুভবুদ্ধি অতি অল্পক্ষণ স্থায়ী থাকতো। ভীষ্ম ও বিদুরের কাছ থেকে অনেক ধর্মকথা শুনলেও, পুত্রপ্রেমে পাগল হয়ে তিনি সঙ্গে সঙ্গে সব ভুলেও গেছে।
ধৃতরাষ্ট্র জানতেন শ্রীকৃষ্ণের সাথে শত্রুতা করলে তাদের সমস্ত কিছুই নষ্ট হবে; কারণ শ্রীকৃষ্ণ ছিল নররুপী ভগবান। তাই, দুর্যোধন শ্রীকৃষ্ণকে বন্দি করতে চাইলে ধৃতরাষ্ট্র বাঁধা দেয়। সন্ধি প্রস্তাবে ভীষ্ম, দ্রোণ, বিদুর ও ধৃতরাষ্ট্র সকলেই শ্রীকৃষ্ণের পরামর্শ মেনে নেওয়ার জন্য দুর্যোধনকে অনুরোধ করে। কিন্তু দাম্ভিক দুর্যোধন যুদ্ধের ঘোষণা দিয়ে সকলের অনুরোধ অমান্য করে। অবশেষে শান্তি স্থাপনে শ্রীকৃষ্ণের শেষ প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়।
ফিরে আসার সময় শ্রীকৃষ্ণ বিদুরকে বলেছিল, “বিদুর, আমি জানি আমার প্রচেষ্টা ব্যর্থ হবে। তবুও একবার শেষ চেষ্টা করেছি, যদি কৌরবদের আসন্ন ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচানো যায়। লোকে জানবে, আমি নিজেও বুঝবো- আমি চেষ্টার ত্রুটি করেনি (উদ্যোগপর্ব)।” সেদিন আসন্ন ভয়াবহ যুদ্ধের হাত থেকে ভারতবর্ষ ও কুরুকুলকে বাঁচানোর সর্বান্তকরণ চেষ্টা করেছিল ভগবান শ্রীকৃষ্ণ......
(পর্ব ৫)
-----------------------------
মহাভারতে ভয়াবহ যুদ্ধের হাত থেকে ভারতবর্ষ ও কুরুকুলকে বাঁচানোর জন্য ভগবান শ্রীকৃষ্ণের সর্বান্তকরণ প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলো। তিনি শান্তি চাইতে গিয়েছিলো বলেই দুর্যোধন-কর্ণরা তাকে বন্দি করার দুঃসাহস দেখিয়েছিল। দুর্যোধনের এই চরম অহংকার যুদ্ধের পথটা এতটাই প্রতিষ্ঠা করে দিল যে, কুরু-পাণ্ডবের যুদ্ধ রূপ নিল ধর্মযুদ্ধে। এই ধর্মযুদ্ধ না করাটাই এখন অন্যায় পাপ হবে।
ভগবান শ্রীকৃষ্ণ যুধিষ্ঠিরকে যুদ্ধের আয়োজন করতে বলে। শান্তির জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করলেও তিনি কাপুরুষতা ও ক্লীবত্বের পক্ষপাতী ছিল না। কৌরবদের সীমাহীন লোভ ও ঈর্ষার জন্য শ্রীকৃষ্ণ মনস্থির করলেন যুদ্ধে জয়ী হয়ে পাণ্ডবদের মাধ্যমে ভারতে ধর্মরাজ্য প্রতিষ্ঠা করবে। কারণ, শ্রীকৃষ্ণের যথার্থ উদ্দেশ্যই হলো-“ধার্মিককে রক্ষা করে দুষ্কৃতির বিনাশ এবং অধর্ম দূর করে ধর্মের সংস্থাপন।”কুরু ও পাণ্ডবগণ যুদ্ধের জন্য অর্থ ও সৈন্য সংগ্রহ করতে শুরু করে। কৌরব পক্ষে যোগ দিয়েছে শ্রীকৃষ্ণের শত্রুরা। ক্ষত্রিয়ের পক্ষে সারথির কর্ম কোনদিন গৌরবজনক নয়, অথচ শ্রীকৃষ্ণ সেই কর্মই স্বেচ্ছায় বেছে নিলো কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে। নিরস্ত্র হয়ে প্রিয় সখা অর্জুনের সারথি হিসেবে শ্রীকৃষ্ণ পাণ্ডবপক্ষে যোগ দিলো। এতে প্রমাণিত হয় যে, ভগবান শ্রীকৃষ্ণের দিব্যজীবনে কোন মানুষী দুর্বলতার স্থান ছিল না।
কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে যারা দুর্যোধনকে সৈন্য দিয়ে সাহায্য করে তাঁরা ছিল সুযোগ-সন্ধানী; যাদের মধ্য অনেকেই কুরুবংশের প্রভাবকে ভাঙতে চায়। এদের মধ্য উল্লেখযোগ্য হচ্ছে মদ্র, অবন্তী, সিন্ধুপ্রদেশ; যাদের সাথে বর্বর জাতিও ছিল। অন্যদিকে, পাঞ্চাল ও যাদববংশ সহ যারা অখণ্ড ভারতের স্বপ্ন দেখেছে তাঁরা সকলেই পাণ্ডবপক্ষে যোগ দেয়।
মহাভারতের যুদ্ধ এমন একটি সময়ে সংঘটিত হয়; যখন সমাজের ক্ষত্রিয়গণ আসুরিক ভাবাপন্ন হয়ে পড়ে। এই সমাজে দুর্যোধন ছিল স্বেচ্ছাচার, দর্প ও অহঙ্কারের প্রতীক। বলা হয়ে থাকে যে, কলিযুগের প্রভাব তখন থেকেই আরম্ভ হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু, শুধুমাত্র শ্রীকৃষ্ণের কারনে কলি তার প্রভাব বিশেষ ভাবে বিস্তার করতে পারে নি।
স্বয়ং ভগবান যার সাথে থাকে, তার ক্ষতি করার সাধ্য কারো নেই। মহাভারতে দুর্যোধন শ্রীকৃষ্ণকে ভগবান ও সর্বসংহার কর্তা জেনেও পাণ্ডবদের প্রতি প্রবল হিংসার কারনে শ্রীকৃষ্ণের প্রতি বিদ্রোহী হয়। আমরা মানুষ; তাই আমাদের জীবনে দুর্বলতা স্বাভাবিক। কিন্তু অত্যধিক দুর্বলটার ফল একসময় আমাদের ভোগ করতেই হয়। মহাভারত আমাদের সেই শিক্ষায় দেয়। গীতায় বলা আছে, “কর্মের ফলদাতা ভগবান এবং এই কর্মই আমাদের সুখ-দুঃখের কারণ।” তাই, কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে নিজ নিজ কর্ম অনুসারেই পাণ্ডবদের জয় ও কৌরবদের পরাজয় ভগবান শ্রীকৃষ্ণ আগেই লিখে রেখেছিলো......
(পর্ব ৬)
-----------------------------
“রাজনীতিতে চিরকালীন বন্ধু বলেও কিছু নেই, চিরকালীন শত্রু বলেও কিছু নেই”- এই কথাটি আমরা সকলেই জানি। এখানে, বন্ধুত্ব ও শত্রুতা দুটোই সৃষ্টি হয় রাজনৈতিক প্রয়োজনে। কিন্তু, মহাভারতের আত্মীয় রাজনীতির মধ্য সবকিছুই অন্যরকম। স্বয়ং ভগবান শ্রীকৃষ্ণই এখানে দক্ষ রাজনীতিজ্ঞ, যাকে বিশ্লেষণ করা আমাদের মত সাধারণ মানুষের পক্ষে ধরা-ছোঁয়ার বাইরে।
মহাভারতে বীরযোদ্ধা ও দক্ষ রাজনীতি বিশারদ হিসেবে যাদব-বংশের বেশ সুনাম ছিল। যাদবদের এই বল ও বুদ্ধির সমন্বয়ে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ গড়ে তোলেন নারায়ণী সেনা। প্রাগজ্যোতিষপুর, গান্ধার ও উত্তর ভারতের শক্তিশালি রাজ্য মগধ সহ অন্যান্য প্রদেশে ধর্মরাজ্য প্রতিষ্ঠা করতে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ এই নারায়ণী সেনা ব্যবহার করেছেন। প্রায় ১০ লক্ষ সৈন্যবিশিষ্ট এই নারায়ণী সেনার প্রধান প্রধান যোদ্ধারা হচ্ছে শ্রীকৃষ্ণ, বলরাম, সাত্যকি, চেকিতান, কৃতবর্মা, শ্রীকৃষ্ণপুত্র শাম্ব প্রমুখ। অশ্বমেধ যজ্ঞের সময় যেসকল রাজা যুধিষ্ঠিরের শ্রেষ্ঠত্ব অস্বীকার করেছে; শ্রীকৃষ্ণের নারায়ণী সেনার সাহায্য নিয়েই যুধিষ্ঠির তাদের পরাজিত করে।
“কুরুক্ষেত্র যুদ্ধে দুর্যোধনের প্রচণ্ড ভয় ছিল শ্রীকৃষ্ণের এইনারায়ণী সেনা নিয়ে। কারণ দুর্যোধন জানতেন, কৌরবদের ধ্বংস করে ধর্মরাজ্য প্রতিষ্ঠা করতে শ্রীকৃষ্ণের এইনারায়ণী সেনাই যথেষ্ট। তাই শকুনির পরামর্শে দুর্যোধন সৈন্য সংগ্রহে শ্রীকৃষ্ণের কাছে আসে। একই সময়ে অর্জুনও সেখানে উপস্থিত হয়। শ্রীকৃষ্ণ উভয়কেই আপ্যায়ন করে তাঁদের উদ্দেশ্য জানতে চায়। শ্রীকৃষ্ণ বলেন, “আমি নিরস্ত্র হয়ে এক পক্ষে যাবো, আর আমার শক্তিশালী নারায়ণী সৈন্য যারা বিক্রমে প্রত্যেকে আমার সমতুল, তারা অপরপক্ষে যুদ্ধ করবে।” অর্জুনকে প্রথমে জিজ্ঞাসা করায় অর্জুন স্বয়ং নারায়ণকেই (শ্রীকৃষ্ণ) স্বপক্ষে বরণ করে আর কপট দুর্যোধন অত্যন্ত আনন্দিত হয় নারায়ণী সৈন্যর প্রতিশ্রুতি পেয়ে।
শ্রীকৃষ্ণ স্বয়ং ভগবান, যার লীলা বোঝা দায়। মহাভারতে আত্মীয়তার দিক থেকে পাণ্ডবরা শ্রীকৃষ্ণের যতটা কাছের, ঠিক ততটাই কাছের দুর্যোধনের দিক থেকে। পাণ্ডবরা ছিল শ্রীকৃষ্ণের পিসতুতো ভাই আর দুর্যোধনের কন্যা লক্ষণা ছিল শ্রীকৃষ্ণের পুত্র শাম্বের স্ত্রী। মনুষ্যদেহ ধারন করে এই পৃথিবীতে এসে শ্রীকৃষ্ণ বাস্তবতাকে মেনে নিয়ে প্রতিমুহূর্তে নিজের কর্তব্য পালন করে গেছেন। তাই নিজেদের মধ্য রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ বন্ধ করতে শ্রীকৃষ্ণ অনেক চেষ্টা করেছেন। কিন্তু, তারপরেও যুদ্ধ অনিবার্য হয়ে ওঠে। পরবর্তীতে, কৌরব ও পাণ্ডব দুই পক্ষই শ্রীকৃষ্ণের সাহায্য চাইলে তিনি কাউকেও অখুশি করেন নি।
কিন্তু, ধৃতরাষ্ট্রের ১০০ সন্তান কুরুক্ষেত্র যুদ্ধে লক্ষ লক্ষ নারায়ণী সেনাকে নেতৃত্ব দিলেও, পঞ্চ-পাণ্ডবের সামনে তারা ছিল তুচ্ছ। কারণ, নিজে যুদ্ধ না করলেও পঞ্চ-পাণ্ডবদের নেতৃত্ব দিয়েছেন দক্ষ রাজনীতিজ্ঞ ও বীর যোদ্ধা স্বয়ং ভগবান শ্রীকৃষ্ণ। স্বয়ং নারায়ন যার পক্ষে, তাঁর কাছে সকল বাঁধাই তুচ্ছ.....






No comments:
Post a Comment